নিমন্ত্রণের রাত
নিমন্ত্রণের রাত(একটি বাস্তব ঘটনার অনুপ্রেরণায় রচিত ছোটগল্প)এম আনওয়ার উল হকবসন্তপুর — নদীর ধারে এক শান্ত গ্রাম। সকালবেলা ধানক্ষেতে কুয়াশা ঝুলে থাকে, বিকেলে পাখিরা দল বেঁধে ফেরে গাছের ডালে। এখানে জীবন চলে ধীরে, ধুলোমাখা গামছার মতো সহজ ও অকপট।কিন্তু কখনও কখনও, এই নির্জন গ্রামও লুকিয়ে রাখে সবচেয়ে হিংস্র রহস্য।অতনু ঘোষ গ্রামের পরিচিত মুখ। ছোট দোকান চালান, কিন্তু মানুষ হিসেবে খুব প্রিয়। হাসিমুখে সবার সঙ্গে কথা বলেন, উৎসবে-অনুষ্ঠানে সাহায্য করেন। তার স্ত্রী মালতীও শান্ত প্রকৃতির মানুষ। সংসার ছোট, কিন্তু ভালোবাসায় ভরা।তবু জীবন কখনও কখনও নীরব ফাঁদ পেতে রাখে।গোবিন্দ ঘোষ, গ্রামের আরেক বাসিন্দা, প্রাক্তন স্কুলক্লার্ক। বছর কয়েক হলো চাকরি হারিয়েছেন। তার স্ত্রী ঝর্না — বয়সে তরুণী, সুন্দরী, আর একটু বেশি মিশুকে।গোবিন্দের মনেও সেই সন্দেহের কাঁটা। গ্রামের ফিসফিসানি থামতে চায় না — “ঝর্না নাকি অতনুর সঙ্গে বেশি কথা বলে।”গোবিন্দ চেষ্টা করে বিশ্বাস করতে, কিন্তু প্রতিরাতে নিজের ভিতরে একটা আগুন জ্বলে ওঠে।একদিন বিকেলে সে ঝর্নাকে বলল,“তুমি ওর সঙ্গে কথা বলবে না। আমি সব জানি।”ঝর্না মাথা নিচু করে বলল, “ও আমার বন্ধু মাত্র, গোবিন্দ।”গোবিন্দ চুপ করে রইল, কিন্তু তার চোখে তখন এক অদ্ভুত দীপ্তি — প্রতিশোধের আগুন।—দু’দিন পরই ঝর্না নিজেই গেল অতনুর দোকানে।“দাদা, এ ক’দিন দেখা নেই! পুজোর পর একটা খাওয়া-দাওয়া হবে আমাদের বাড়িতে। আসবেন?”অতনু একটু হেসে বলল, “আহা, অবশ্যই আসব। তোমাদের নিমন্ত্রণ কি ফেরানো যায়?”সেই হাসিটাই ছিল তার শেষ হাসি।—২১ অগস্ট সন্ধে। আকাশে মেঘ, বাতাসে হালকা গন্ধ। অতনু নতুন পাঞ্জাবি পরে বেরোল। মালতী জিজ্ঞেস করল,“দেরি করো না, রাত হলে ফেরো।”অতনু হেসে বলল, “এই তো, একটু খেয়ে চলে আসব।”মালতী তখন জানত না, এই কথাই শেষ বিদায়।রাত দশটা বাজে, অতনু ফেরেনি। ফোনেও ধরছে না।মালতী উদ্বিগ্ন হয়ে গোবিন্দদের বাড়ি গেল। ঝর্না তখন দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,“ও তো খেতে আসেনি আজ, দিদি!”মালতী স্তব্ধ হয়ে গেল।—তিনদিন পর, থানায় অভিযোগ দায়ের করল মালতী ঘোষ।অফিসার প্রদীপ হালদার নেমে পড়লেন তদন্তে।প্রথমেই নজর গেল গোবিন্দ আর ঝর্নার দিকে।গ্রামের কয়েকজন বলল, “ওদের সঙ্গে শেষ দেখা গিয়েছিল অতনুর।”তদন্ত শুরু হলো। জেরা করা হলো ঝর্নাকে।প্রথমে সব অস্বীকার, তারপর কান্না।“আমি কিছু করিনি… গোবিন্দই সব করেছে…”অফিসার শান্ত গলায় বললেন, “বলো ঝর্না, কী করেছিলে তোমরা।”ঝর্না একবার মাথা তুলল — চোখ লাল, মুখ শুকনো।“গোবিন্দ বলেছিল, যদি আমি সাহায্য না করি, তাহলে আমাকে তাড়িয়ে দেবে। আমি ভয় পেয়েছিলাম। তাই ফোনে অতনুদাকে ডেকেছিলাম… ওরা তিনজন মিলে তাকে নিয়ে গেল বাঁশবনের ভিতরে। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম রাস্তার পাশে।তারপর…”তারপর আর কিছু বলতে পারেনি ঝর্না।—পুলিশ ধরে আনল গোবিন্দ আর তার দুই ভাইকে।তিনজনের মুখে একই স্বীকারোক্তি —অতনুকে তারা গলা টিপে মেরেছে, তারপর প্রমাণ লোপাটের জন্য মাথা আলাদা করে ফেলেছে।মাথা পুঁতে রেখেছে বাঁশবনের মাটিতে, দেহটা ছুঁড়ে দিয়েছে নদীতে।এক সপ্তাহ পর, নদীর জেলে ভোরে জাল ফেলতে গিয়ে থমকে গেল।জালের ফাঁদে উঠে এল এক মুণ্ডহীন দেহ।খবর ছড়িয়ে পড়ল। মালতী গেল শনাক্ত করতে।দেহের গায়ে সেই পাঞ্জাবি — নীল বর্ডারওয়ালা।মালতী হাউমাউ করে কেঁদে উঠল,“এ আমার অতনু…”—ফরেনসিক রিপোর্ট জানাল — বাঁশবনে পোঁতা খুলি আর নদীতে ভাসা দেহ একই ব্যক্তির।সব প্রমাণ মিলে গেল এক জায়গায়।তিন বছর পর আদালতের রায় ঘোষিত হলো।বিচারক রায় পড়ে শোনালেন —“চার অভিযুক্তকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।”আদালত ঘরে নিস্তব্ধতা।মালতী চোখ মুছতে মুছতে ফিসফিস করে বলল,“ন্যায়বিচার হলো… কিন্তু আমি কাকে নিয়ে বাঁচব এখন?”—বসন্তপুরের বাঁশবনে আজও কেউ সন্ধের পর যায় না।লোকমুখে ছড়িয়ে পড়েছে—সেই রাতে এক মৃদু গান ভেসে আসে,যেন অতনুর গলা থেকে, দূর থেকে বলে ওঠে—“ঝর্না, আমি এসেছিলাম নিমন্ত্রণে… ফিরে যেতে পারিনি…”