| |

স্বাধীনতার সাত দশক পরেও হয়নি সেতু, দুর্ভোগের নাম বাখরাবাদএম আনওয়ার উল হকস্বাধীনতার সাত দশক পার হলেও আজও উন্নয়নের আলো পুরোপুরি পৌঁছায়নি মালদা জেলার বহু গ্রামে। সেই চিত্রই ফুটে উঠছে কালিয়াচক-৩ ব্লকের বৈষ্ণবনগর বিধানসভার অন্তর্গত বাখরাবাদ গ্রাম পঞ্চায়েতের চক দেওনাপুর ভুটু মাঝি ঘাটে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে হাজারো মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা একটি ছোট নৌকা। অথচ এই নদীর উপর একটি সেতু নির্মাণের দাবি এলাকাবাসীর বহু পুরনো।বাখরাবাদ গ্রাম পঞ্চায়েতের চক দেওনাপুর, গোরারগাঁও, চাঁদপুর, রামচন্দ্রপুর, ইসলামপুর ও আশপাশের প্রায় দশটি গ্রামের বাসিন্দারা প্রতিদিন এই ঘাট পারাপারের উপর নির্ভরশীল। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, বাজার— জীবনের প্রতিটি প্রয়োজনে এই নদী পার হওয়াই একমাত্র উপায়। দিনের বেলায় নৌকা চলাচল থাকলেও রাত নামলেই বন্ধ হয়ে যায় যাতায়াত। ফলে অসুস্থ মানুষ, গর্ভবতী মহিলা কিংবা কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে তিন কিলোমিটার ঘুরপথে যেতে হয় বৈষ্ণবনগর বা বাখরাবাদের মূল রাস্তায়।স্থানীয় বাসিন্দা রহিম শেখ জানান, “আমাদের বাচ্চারা প্রতিদিন স্কুলে যায় এই নদী পার হয়ে। নৌকায় চাপাচাপি, ভিড়, ঝুঁকি— সবকিছু নিয়েই বেঁচে থাকতে হচ্ছে। অনেক সময় নৌকা উল্টে দুর্ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু প্রশাসন কোনও গুরুত্ব দেয়নি।”আরেক বাসিন্দা রুবিনা বিবি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রতিবার ভোটের আগে সবাই এসে বলে— ‘সেতু হবে, কাজ শুরু হবে’। কিন্তু ভোট মিটলেই সব চুপ। বর্ষাকালে জল বেড়ে গেলে নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তখন আমাদের একেবারে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকতে হয়।”গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, স্কুলপড়ুয়া শিশুরা প্রতিদিনই বড় বিপদের মধ্যে পড়ে। অনেক সময় প্রবল স্রোতে নৌকা দুলে পড়ে যায়, বইখাতা ভিজে যায়। একাধিকবার নৌকা ডুবির ঘটনাও ঘটেছে, তবে সৌভাগ্যবশত বড় দুর্ঘটনা এড়ানো গেছে। তবু আতঙ্কের মধ্যে প্রতিদিন যাতায়াত করতেই হয় তাদের।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসন ও পঞ্চায়েতের কাছে বহুবার লিখিত আবেদন জানানো হয়েছে সেতু নির্মাণের জন্য। এমনকি একাধিকবার দফতরে নকশা পাঠানো হলেও প্রকল্প বাস্তবায়ন এখনও কাগজেই সীমাবদ্ধ। জেলা পরিষদ ও ব্লক প্রশাসনের উদ্যোগের অভাবকেই দায়ী করছেন এলাকাবাসী।গ্রামের প্রবীণ সমাজসেবক মতিউর রহমান বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকে যত সরকার এসেছে, সবাই উন্নয়নের বড় বড় কথা বলেছে। কিন্তু বাস্তবে আমাদের ঘাট আজও সেই আগের মতোই আছে। একটি সেতু না থাকায় আমরা পিছিয়ে পড়েছি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ক্ষেত্রেও।”বর্ষাকাল এলে সমস্যা চরমে ওঠে। নদীর জলস্রোত বেড়ে গেলে ছোট নৌকা চালানোই সম্ভব হয় না। তখন পুরো এলাকাই যেন মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে গর্ভবতী মহিলাদের বা গুরুতর অসুস্থ রোগীদের নিয়ে হসপিটালে পৌঁছানোও এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।এলাকাবাসীর দাবি, চক দেওনাপুর ভুটু মাঝি ঘাটে একটি স্থায়ী পাকা সেতু নির্মাণ এখন আর বিলাসিতা নয়, একান্ত প্রয়োজন। তারা প্রশ্ন তুলছেন— “দেশে চাঁদে যাওয়ার প্রযুক্তি যখন এসেছে, তখন আমাদের এই নদীর উপর একটি সেতু নির্মাণ এত কঠিন কেন?”এ প্রসঙ্গে এক স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অবস্থায় জানান, “বিষয়টি বহুবার আলোচিত হয়েছে। প্রস্তাবও গিয়েছে সংশ্লিষ্ট দফতরে। কিন্তু কোনো কারণে এখনো অনুমোদন মেলেনি। আশা করছি আগামী অর্থবর্ষে হয়তো কিছু অগ্রগতি হবে।”তবে সেই আশাতেই আজও বেঁচে আছে বাখরাবাদের মানুষ। প্রতিদিন প্রাণ হাতে নিয়ে নদী পারাপার করছেন তারা, আর অপেক্ষা করছেন— কবে তৈরি হবে সেই কাঙ্ক্ষিত সেতু, যা বদলে দেবে তাদের জীবনের পথ।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *