কয়েক দিনের মধ্যেই উল্টে পড়ল নতুন গার্ডপোল, ক্ষোভে ফুঁসছেন মানুষ
কয়েক দিনের মধ্যেই উল্টে পড়ল নতুন গার্ডপোল, ক্ষোভে ফুঁসছেন মানুষ

এম আনওয়ার উল হক,, ২১ অক্টোবর: কালিয়াচক ৩ ব্লকের বেদরাবাদ গ্রাম পঞ্চায়েতের মীর্জাচক পশ্চিম পাড়ার রাস্তায় কিছুদিন আগেই নতুন গার্ডপোল বসানো হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল পথচলতি মানুষ ও যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই উদ্যোগই এখন হাস্যকর ও ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বসানোর মাত্র দশ দিনের মধ্যেই একে একে সব গার্ডপোল পড়ে গেছে রাস্তায়।অভিযোগ, গার্ডপোলগুলি সঠিকভাবে মাটির গভীরে পোঁতা হয়নি এবং রাস্তার পাশে ফেলা মাটিও ছিল আলগা ও অপর্যাপ্ত। ফলে, সামান্য বাতাসের ধাক্কা বা গরু-বাছুরের ঘেঁষা লাগলেই গার্ডপোলগুলি উল্টে পড়েছে।বেদরাবাদ গ্রাম পঞ্চায়েতের সিপিআই(এম) সদস্য তনুশ্রী মণ্ডল জানান, “আমরা যখন রাস্তায় গিয়েছিলাম, তখনই বুঝেছিলাম কাজটা ঠিক হচ্ছে না। গার্ডপোলগুলি অত্যন্ত ছোট, মাটির গভীরে পোঁতা হয়নি। রাস্তার পাশে যে মাটি ফেলা হয়েছিল তা ছিল অল্প এবং আলগা। আমরা বারবার ঠিকাদারি সংস্থাকে সতর্ক করেছিলাম, কিন্তু তারা কর্ণপাত করেনি। মাত্র দশ দিনের মধ্যেই সব গার্ডপোল পড়ে গেছে। এটা নিছক দুর্নীতি ছাড়া আর কিছু নয়।”তিনি আরও বলেন, “এর আগেও প্রধানমন্ত্রী সড়ক যোজনার অধীনে এই রাস্তাটি তৈরি হচ্ছিল। তখনও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছিল। আমরা অভিযোগ করার পর ইঞ্জিনিয়ার এসে পরীক্ষা করে পুনরায় কাজ করার নির্দেশ দেন। পরে কাজ ভালোভাবে সম্পন্ন হয়। কিন্তু এখন আবার একই রাস্তার গার্ডপোল প্রকল্পে একই রকম দুর্নীতি দেখা যাচ্ছে।”স্থানীয় বাসিন্দা প্রফুল্ল মণ্ডল বলেন, “আমরা কাজের সময়ই বুঝেছিলাম গার্ডপোল ঠিক মতো বসানো হচ্ছে না। পঞ্চায়েত সদস্যকে জানিয়েছিলাম। তিনি এসে ঠিকাদারি সংস্থাকে বলেন, কিন্তু তারা শোনেনি। নিজেদের মতো করে কাজ সেরে চলে যায়। এখন গার্ডপোল পড়ে আছে রাস্তার ওপর, দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।”প্রফুল্লবাবুর দাবি, এলাকার মানুষ নিজের চোখে দেখেছে কীভাবে গার্ডপোলগুলিকে অগভীরভাবে পোঁতা হচ্ছিল। “এটা নিছক অসাবধানতা নয়, এটা সরকারি টাকার অপচয়,” বলেন তিনি।ঠিকাদারি সংস্থা ভলগা এন্টারপ্রাইজ-এর সুপারভাইজার আব্দুল রাজ্জাক অবশ্য অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। “গার্ডপোলের কাজ পুরোপুরি সিডিউল অনুযায়ী করা হয়েছে। এই অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে গার্ডপোলগুলো উপড়ে ফেলেছে। এমনও কিছু তথ্য আমাদের কাছে আছে যে, কয়েকজন লোক কাটমানি দাবি করেছিল। আমরা দিতে রাজি না হওয়ায় এখন তারা এসব অভিযোগ ছড়াচ্ছে।”কালিয়াচক ৩ ব্লক প্রশাসনের এক আধিকারিক জানান, “এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও লিখিত অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে যদি অনিয়ম প্রমাণিত হয়, উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রের দাবি, গার্ডপোল প্রকল্পটি প্রায় ৮ লক্ষ টাকার কাজ ছিল। অভিযোগ, নির্দিষ্ট নিয়ম না মেনে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে দ্রুত কাজ শেষ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল সময়ের মধ্যে কাজ সম্পূর্ণ দেখিয়ে বিল পাশ করানো। স্থানীয়দের ধারণা, কাজের প্রাথমিক ধাপেই গার্ডপোলগুলির দৈর্ঘ্য কমানো হয়েছে, ফলে মাটির ভেতরে পোঁতার গভীরতা যথেষ্ট হয়নি।এলাকার এক প্রবীণ বাসিন্দা অরবিন্দ দাসের কথায়, “রাস্তা বানাতে যেমন তদারকি দরকার, তেমনি গার্ডপোল বসানোতেও প্রকৌশলীর উপস্থিতি থাকা উচিত ছিল। কিন্তু এখানে কেউ নজরদারি করেনি। তাই এমন বিপর্যয়।”রাস্তায় এখন গার্ডপোল পড়ে রয়েছে এদিক-ওদিক, যা শুধু দুর্নীতির নিদর্শন নয়, বরং পথচলতি মানুষ ও যানবাহনের জন্যও বিপজ্জনক। বিশেষত রাতের বেলা এই পড়ে থাকা গার্ডপোলগুলিতে ধাক্কা খেয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা প্রবল।স্থানীয় যুবক রাজীব শেখ বলেন, “সরকারি টাকায় এমন নিম্নমানের কাজ হলে উন্নয়ন শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে। আমরা চাই এর সুষ্ঠু তদন্ত হোক।”স্থানীয়রা ইতিমধ্যেই ব্লক অফিসে লিখিত অভিযোগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তারা চান, ব্লক প্রশাসন ও জেলা ইঞ্জিনিয়াররা সরেজমিনে এসে তদন্ত করে দেখুক কীভাবে সরকারি অর্থে তৈরি গার্ডপোল মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ভেঙে পড়ল।